দুটি অভিজাত এলাকায় বাসা ভাড়ার পার্থক্যটা বিশাল
দুটি এলাকাকে ভাগ করেছে একটি সড়ক। দুটিই অভিজাত এলাকা হিসেবে স্বীকৃত। তবে একটির আভিজাত্য একটু বেশি।
এ কারণে ৫০ থেকে ৬০ ফুটের সড়কের দুই পাশের এলাকায় বাসা ভাড়ায় পার্থক্যটা বিশাল। এক পাশে ৪০ হাজার টাকার কমে ভাড়া মেলে না। তবে অন্য পাশে মেলে অর্ধেকেরও কমে। সড়কের পশ্চিম পাশের এলাকাটি ধানমন্ডি।
আর পূর্ব পাশের এলাকার নাম কলাবাগান। দুটি এলাকা ঘুরে বাড়ি ভাড়ার বিশাল পার্থক্য চোখে পড়ে। ধানমন্ডি আবাসিক এলাকায় ৮/এ এবং ২২ নম্বর সড়কের ধারে যতগুলো বাসা চোখে পড়েছে তার কোনোটির ভাড়াই মাসে ৪০ হাজার টাকার নিচে নয়। সঙ্গে সার্ভিস চার্জ যোগ হয় আরও সাত থেকে আট হাজার টাকা।
এই বাড়িগুলোতে কমপক্ষে তিনটি শয়নকক্ষ আছে। আর রাস্তার অপর পাশের কলাবাগানে তিন শয়নকক্ষের পাশাপাশি দেখা মেলে দুই শয়নকক্ষের বাসাও।
দুই শয়নকক্ষের একাধিক বাড়ির ভাড়া জানতে চাইলে কেয়ারটেকার বলেন, ১৯ হাজার টাকা দিতে হবে। সঙ্গে সার্ভিস চার্জ পাঁচ হাজার টাকা। অর্থাৎ দুই এলাকায় বাসা ভাড়ার পাশাপাশি সার্ভিস চার্জও কম বেশি হয়।
ধানমন্ডিতে দুই শয়নকক্ষের বাসা বিরল হলেও কলাবাগানে অবশ্য অভাব নেই। তিন শয়নকক্ষ খুঁজতে গেলে গুনতে হয় আরও চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা।
ধানমন্ডিতে থাকেন উচ্চবিত্ত পরিবারের মানুষ। টাকার প্রবাহ বেশি না থাকলে এখানে আবাস গড়ার চিন্তা না করাই ভালো।
আর যাদের আয় তুলনামূলক একটু কম, তাদের খোঁজ করতে হয় তুলনামূলক কম ভাড়া এমন এলাকা। যেমনটা দেখা যায় কলাবাগান, বনশ্রী, বাড্ডা, মিরপুর ইত্যাদি এলাকায়।
এই বাসা ভাড়া নির্ধারণ হয় মূলত বাড়ির মালিকদের মর্জিমতো। দেন দরবার করে ভাড়া নির্ধারিত হলেও ভাড়াটেরা একটু দুর্বল অবস্থানেই থাকেন।
সরকার বিভিন্ন এলাকা ভেদে বর্গফুট অনুযায়ী ভাড়া সুনির্দিষ্ট করে দিলেও মানে না বলতে গেলে কেউই।
সিটি করপোরেশন গুলশান এলাকায় প্রতি বর্গফুট ১৫ থেকে ১৬, বনানীতে ১৪ থেকে ১৬, নাখালপাড়ায় ছয় থেকে সাত, শান্তিনগরে আট থেকে নয় এবং ধানমন্ডিতে ১১.২৫ টাকা নির্ধারণ করে দিলেও এই হারে ভাড়া পাওয়া যাবে না কোথাও।
সরকারনির্ধারিত হারের দুই থেকে চার গুণ আদায় করছে বাড়ির মালিকরা।
দুই এলাকায় ভাড়ার এতো পার্থক্য কেন?
ধানমন্ডির সড়কগুলো চওড়া, সড়কের পাশে আছে গাছ। বিকাল বেলায় হাঁটতে চাইলে আছে সুন্দর লেক পার। খেলার জন্য আছে মাঠ বা পার্ক। সেই তুলনায় কলাবাগান এলাকাটি কিছুটা ঘিঞ্জি। এখানকার ভেতরের সড়কগুলো সেভাবে চওড়া নয়, আবার ভাঙাচোরাও।
সড়কের জন্য এই এলাকার আদি বাসিন্দারা সেভাবে জায়গা ছাড়েনওনি। খোলা জায়গা নেই বললেই চলে। আর গাছ? সেটি হঠাৎ চোখে পড়বে একটি দুটি।
কলাবাগান এলাকার বাসিন্দা ফারিয়া হক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। ঢাকাটাইমসকে তিনি বলেন, ‘৯০০ স্কয়ারফিটের দুই বেডের জন্য আমাদের দিতে হয় ১৯ হাজার টাকা। সার্ভিস চার্জ আলাদা।
হিসেব করলে আসে ২৪ হাজার টাকা। এটা অবশ্যই বেশি।’ তিনি বলেন ‘অপর পাশে ধানমন্ডিতে থাকতে কার না ভালো লাগে, কিন্তু সামর্থ্যটাও তো দেখতে হবে।’
ধানমন্ডি ৮/এ এলাকার বাসিন্দা আবদুর রশীদ পেশায় শিক্ষক। তিনি তার ফ্ল্যাটের ব্যাপারে ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘এখানে ফ্ল্যাটের আকার একটু বড়। তিন বেডের নিচে এই এলাকায় ফ্ল্যাট পাওয়া যায় না। আমাদের তিন বেডের জন্য সব মিলিয়ে দিতে হয় ৪৮ হাজার টাকা করে।
মাসে যা আয় করি তাঁর অর্ধেকের বেশি দিতে হয় এই ভাড়ার পেছনে।’ বিকাল বেলায় নির্মল বাতাস সেবন করতে চাইলে যেতে হবে সড়কের অপর পাশ ধানমন্ডিতেই। আর এই পার্থক্যটাই দুই এলাকার বাড়ি ভাড়ায় বিরাট পার্থক্য এনে দিয়েছে।
রাজধানী ঢাকায় প্রায় দেড় কোটি মানুষের বসবাস। যেভাবে মানুষ বাড়ছে সেভাবে বাড়ছে ফ্ল্যাট বাড়ির ভাড়া। এক হিসাবে দেখা যায়, গত দশ বছরে বাসা ভাড়া বেড়েছে প্রায় ৯০ গুণ।
ফলে মানুষ যা আয় করছে তার বেশিরভাগ চলে যাচ্ছে বাসা ভাড়ায়। সরকার কর্তৃক ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন থাকলেও তা মানছেন না বাড়ির মালিকরা।
নিজেদের ইচ্ছেমত ভাড়া বাড়ানোর ফলে নাজেহাল হতে হচ্ছে সাধারণ মানুষের। এ নিয়ে ভাড়াটেদের বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবাদ গণমাধ্যমে মাঝেমধ্যে সংবাদ হয়ে আসলেও তার প্রভাব নেই এতটুকু।
বাড়িওয়ালারা বলতে গেলে প্রতি বছরই ভাড়া বাড়ান। আর এই প্রবণতার কারণে বছর শেষে বাড়ি পাল্টানোর ঘটনা বেড়ে যায়।
তবে হয়রানি কমার আশায় নতুন বাসায় গিয়েও আদতে লাভ হয় কমই। কারণ বাসা পাল্টানোর খরচ আর ঝক্কি বিবেচনা করলে লাভের অংকটা অনেক ক্ষেত্রে শূন্যই থাকে।
বাসা ভাড়া প্রসঙ্গে কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-ক্যাব এর সহসভাপতি এস এম নাজেম হোসাইন বলেন, ‘যে যার ইচ্ছেমত ভাড়া বাড়াচ্ছে।
বাড়ির মালিকরা জানে যে এর জন্য শাস্তির ব্যবস্থা আছে। কিন্তু ভাড়াটিয়ারা এ বিষয়ে অবগত নন। এই কারণেই বাড়ির মালিকরা ভাড়া বাড়ানোর সুযোগ নিচ্ছে।’

0 comments:
Post a Comment
Thanks for your comments.