মাতৃস্তন্য দুগ্ধ শিশুর অমৃত আধার


সর্বযুগে সর্বদেশে মাতৃস্তন্য পান ও মাতৃস্তন্য দান নবজাত শিশুর জীবন সংরক্ষণ ও বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এক চিরন্তনী অপরিহার্য সত্য। ক্ষেত্রে বিশেষে নবমাতার কোনো শারীরিক অসুস্থতার জন্য শিশুকে অন্য জননীর স্তন্য পান করিয়ে বাঁচিয়ে হয়তো রাখা হয়েছে, কিন্রু সাধারণতঃ ম,আনব জাতির ইতিহাসে মাতৃস্তন্যপান একটি সার্বিক সাধারণ সত্য।


শিশুর বেঁচে থাকার জন্য এর থেকে জীবনদায়িনী সঞ্জীবনী আর নেই। এক সময়ে মাতৃস্তনের কোনো বিকল্পই ছিল না। ক্রমে গরুর, ছাগলের দুধ পান করানোর উপকারিতা স্বীকৃত হয়। তারপরে সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে দেখা দেয় কৃত্রিম পদ্ধতির দুধ। বেবিফুড না কৌটোর দুধ। সমাজ জীবনে মায়েদের ভূমিকাও পরিবর্তিত হোল।

নানা প্রয়োজনে মায়েরা ঘরের চৌহদ্দির বাইরে পা ফেললেন, ফেলতে বাধ্য হলেন। শিশু রইল ঘরে। শিশুর খাবার চাহিদা, অন্যদিকে বিকল্প ব্যবস্থার আয়োজন—ফলে মাতৃস্তন্য দান তুলনায় কমে এল। সভ্যতার চাকচিক্যে স্তন্যপান আরো একটা কারণে কমে আসে। শিশুর কাছে মায়ের স্তন পীযূষ—অমৃত আধার। বয়স্কদের কাছে সেই স্তনই নারীর যৌন আবেদনের উচ্চকিত প্রকাশ । বিজ্ঞাপন থেকে চলচিত্রে, ছবি থেকে ভাস্কর্যে নারীর স্তনের মধ্য দিয়ে যৌন আবেদনী শক্তিকে প্রকাশ করার ভাবনা পুরুষদের সব সময়ই আগ্রহী করে তুলেছে। ফলে কিছু মানুষ স্তন্যপান করানোর মধ্যেও যৌনাবেগকে দেখেছে। যার ফলে প্রাচীন কালে যা ছিল স্বাভাবিক—আধুনিক যুগে এসে প্রকাশ্য শিশুকে সেই স্তন্যপান পান করানো অনেকের কাছে অশ্লীল বলে মনে হতে থাকে।

 মানবজাতির সৌভাগ্য—চিন্তার এই দৈন্যের অপসারণ ঘটেছে। অতি আধুনিক সময়ে গবেষণা, পরীক্ষা নিরীক্ষা এবং প্রচারে জানা যাচ্ছে শিশুর জীবনে মাতৃস্তন্যের কোনো বিকল্প হয় না। মায়ের বুকের দুধ নবজাত শিশুকে যে জীবনী শক্তি দান করে তার বিকল নেই। বর্তমানে চিকিৎসকরা, ধাত্রীরা এবং বেশ কিছু সমাজ সেবী সংগঠন এ ব্যাপারে ব্যাপক প্রচারেও নেমেছেন। জন সমক্ষে শিশুকে স্তন্যপান করানো কোনো নারীর যৌন আকুতি প্রকাশ নয়—চিরন্তনী মাতৃস্বরূপপিণী মহাশক্তির সৌন্দর্য বিকাশ। কিন্তু মনে রাখা দরকার কেবল ভাসাভাসা প্রচারে আধুনিক সমাজে প্রকাশ্য বা অন্তরালেও স্তন্যপান করানোর প্রয়োজনীয়তা নারী—পুরুষ কারোর কাছেই ততটা গুরুত্ব পাবে না, যতটা গুরুত্ব পাবে স্তন্যদান করানোর পেছনে বৈজ্ঞানিক ভিক্তির ব্যাখ্যায়।

বিজ্ঞান সম্মত গবেষণা লদ্ধ সত্যকে প্রচার করলে মানুষকে সেই সত্য বোঝালে যতটা কাজ দেবে, মায়েদের উপলদ্ধি ও জড়তা ভাঙ্গার প্রয়াস যতটা জোর হবে, অন্য কিছুতেই তা সম্ভব নয়। রাসায়নিক পদ্ধতিতে তৈরী বেবি—ফুড শিশুর প্রয়োজনীয়তা মেটায় না এ কথা কেউ বলতে পারবেন না, তথাপি মাতৃস্তন্য পান করানোর পেছনে জোরালো যুক্তি কি? আমার নিজের শরীরের উৎস থেকে বেরিয়ে আসা পীযুষধারায় আমি আমার সন্তানকে জীবনীশক্তি দিচ্ছি—এই বোধ যে কোনো মাকে যতটা উজ্জীবিত করতে পারে অন্য কোনো বক্তব্যেই বোধ হয় মায়েদের অতো উৎসাহিত করতে পারবে না। আগেকার কু—সংস্কার কেটে গেছে। আধুনিক ব্যবস্থা তৈরী হয়েছে। মাতৃস্তন্য পান বিপরীতে তৈরী হয়েছে দু’দুটো ধারালো অস্ত্র। প্রশ্ন তো উঠতেই পারে তবে কেন শিশুকে সস্তনবপান করতেই হবে? সে ক্ষেত্রে যুক্তি একটাই—নিজের রক্তে মাংসে তৈরী, নিজের গর্ভে বর্ধিত শিশুকে, নিজের শরীরের অমৃত দিয়ে বাঁচিয়ে রাখুন—তাতে যে আনন্দ—স্বর্গ ভালও তার কাছে কিছু নয়। আমার সন্তান বেড়ে উঠেছে আমারই বুকের দুধে—এ গৌরব থেকে কেন কোনো মা নিজেকে বঞ্চিত করবেন? সাধারণ কয়েকটি যুক্তি যখনই কোনো নারী গর্ভবর্তী হন, আসন্ন প্রসবা হয়ে উঠেন, মাতৃস্তন্যপানের প্রশ্ন তাঁর সামনে এসে দাঁড়ায়। কেউ কেউ এ বিষয়ে নিরদ্ধিধায় থাকেন। তাঁদের কাছে এটা কোনো প্রশ্নই নয়। ভাবনার বিষয়ও নয়। কিন্তু কেউ কেউ ভাবেন তাহলে তো বড় বেশী জড়িয়ে পড়ব। শিশু তো আমাকে এক মুহূর্তের জন্য ছাড়তে চাইবে না।

আমার চাকরি আছে বা বাড়ির বাইরে বাইরে থাকার দরকার আছে আমার বাচ্ছা তো তখন অসুবিধেয় পড়বে। বাচ্ছাকে সঙ্গে নিয়ে গেলেও বাইরের লোকের সামনে কি করে দুধ খাওয়াব? দরকার নেই ওসব ঝামেলায়। তাঁর থেকে বোতলে দুধ খাওয়ানো অনেক কম ঝামেলার । নি—ঝনঝাট থাকা যাবে। কিন্তু কোনটা করণীয়? ঝনঝাট মুক্ত থাকা না শিশুকে সুস্থ্য স্বাভাবিক এবং সুন্দর করে বাঁচার পথ তৈরী করে দেওয়া? √ মনে রাখা দরকার মায়ের বুকের দুধে একটি শিশুর প্রয়োজনীয় তাবৎ বস্তু থাকে। এতে আছে প্রোতিন, ফ্যাট, কার্বোহাইড্রেটস, মিনারেলস, ভিটামিনস এবং সঠিক মাপে। যে দেশে যে শিশুর এই পদার্থগুলি ঠিক যতটা প্রয়োজন সে দেশের মায়ের বুকের দুধে সেটা ঠিক ততটাই থাকে। নীচে

একটি তালিকা দেওয়া হলঃ— পরিমাণ গ্রাম/১০০.লিটার।

স্থান
 প্রোটিন
 ফ্যাট
 ল্যাকটোজ
(দুগ্ধ জাতীয় শর্করা)
অস্ট্রোলিয়া
১.৪১
৪.৯৫
৬.৪৬
 ইংল্যাণ্ড
১.০৭
৪.২০
৭.৪০
ইজিপ্ট
০.৯৩
৪.০১
৬.৪৮
ভারত
১.০৬
৩.৩৪
৭.`৪৭
ইন্দোনেশিয়া
১.৬৭
৩.৩৩
৭.১৪
নিউগিনি
১.০১
২.৩৬
৭.৩৪
পাকিস্তান
০.৯০
২.৭৩
৬.২০
দঃ আফ্রিকা
১.৩৫
৩.৯০
৭.১০
যুক্তরাষ্ট্র
১.২৭
৪.৫৪
৭.১০






( মা কি খেলেন বা কতটা খেলেন তার উপর কিন্তু বুকের দুধের মধ্যে শিশুর প্রয়োজনীয় সারবস্তুর হেরফের ঘতেনা। তবে দুধের পরিমাণের তারতম্য ঘটতে পারে।)

 √ বুকের দুধ খেলে শিশুর গ্যাস্টো এনটেরাইটিস, পেট খারাপ বা অন্য কোনো হজম সংক্রান্ত রোগ থেকে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা থাকে না। বোতল সংক্রামিত হয়ে গেলেদ, তা থেকে রোগাক্রান্ত হবার সম্ভাবনা থাকেই। মায়ের দুধ বিপরীত দিক থেকে শিশুকে এ ধরণের সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে। শিশুর হজম প্রক্রিয়ায় কোনো মারাত্মক ব্যাকটিরিয়া আক্রমণ থেকে শিশুকে রক্ষা করে এই দুধ।

শিশুকে শ্বাস—প্রশ্বাসের কোনো কোনো রোগ থেকে বাঁচায় মায়ের দুধ। মা যদি আগে কোনো সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকেন এবং তার প্রতিষেধক নিয়ে থাকেন তবে সেই রোগ থেকেও মায়ের দুধ শিশুকে প্রতিরোধ ক্ষমতা দেয়।

 √ শিশুকে যদি অন্য কোনো খাদ্য সরবরাহ করা হয়, যা শিশুর শরীর সঠিকভাবে হজম করতে পারছে না, তবে তাতে এ্যালার্জি হতে পারে। যেমন ধরা যাক গরুর দুধ। গরুর দুধে মায়ের বুকের দুধের দ্বিগুণ পরিমাণে প্রোটিন থাকে। এটা সদ্যোজাত শিশুর শরীরে এ্যালার্জি তৈরী করতে পারে। এমন কি পরিবারে অন্য কোনো সদস্যের হাঁফানি, একজিমা জাতীয় আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে পারে।

 √ মায়ের বুকের দুধ খাওয়ার দীর্ঘস্থায়ী সুফলও আছে। যে মানুষ শিশু অবস্থায় বুকের দুধ খেয়েছেন তাঁর হৃদরোগ অথবা হজমের গোলমাল হওয়ার সম্ভবনা কম। বোতলে দুধ খেলে অনেক সময়ে শিশু স্বাভাবিকের থেকে বেশী ওজনের হয়, সেটা ভালো নয়। বোতলের দুধ খেলে দাঁতের রোগ দেখা দিতে পারে! উলটো দিকে যে শিশু মায়ের দুধ খায় তাকে স্তনবৃন্ত চুষতে হয় অনেক জোরে। তাতে চোয়াল শক্ত হয়। বুকের দুধ খাওয়া শিশুদের মধ্যে মুখ ও চোয়ালের বিকৃতির সম্ভাবনা কম।

√ মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যায় বলে মাতৃস্তন্য দান শিশুর মানসিক চাহিদাকে পরিতৃপ্তি করে। শিশু তাঁর চাহিদা বয়স্কদের মতো মুখে প্রকাশ করতে পারে না, নানা ভাবে আকারে ইঙ্গিতে পরোক্ষ ভাবে প্রকাশ করে সেটা বুঝে নিতে হয়। তবে বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে শিশুরা সব সময়ে বয়স্কদের উষ্ণ সান্নিধ্য কামনা করে।

এই চাহিদা তাদের খাদ্যের মতোই অপরিহার্য। মায়ের বুকের দুধ খাওয়ার সময়ে তারা তাদের সব চেয়ে আপনজনের ঘন সান্নিধ্য পায়। এটা তাদের মানসিক তৃপ্তি।

 √ শিশুদের শিশুদের কাছে চোষণ একটা অতি আরামদায়ক ব্যাপার। পরিতৃপ্তিকর অভিজ্ঞতা। বোতলের নিপল চোষার থেকে মাতৃস্তন্যবৃন্ত চোষার ত্যাদের মানসিক আরাম অনেক বেশী। উষ্ণ, জীবন্ত স্তনবৃন্ত তাদের মনকে ভরিয়ে তোলে। এছাড়া শিশুরা তাদের ভেতরের একটা অন্তর্নিহিত বোধ থেকে বোঝা কতক্ষণ দুধ টানতে হবে। স্তনবৃন্ত থেকে মুখ সরিয়ে নেওয়া তাদের কাছে অনেক সহজ। বোতলে সেটা কষ্টসাধ্য।

 √ শিশুরা এও বোঝে তাদের চাহিদা অনুযায়ী দুধের মধ্যে কোনো গুণগত তাঁর তম্য ঘটছে কি না। একটি স্তন কিছুক্ষণ টানার পর তারা যদি বোঝে যযে সেই স্তনদুগ্ধের গুণগত তারতম্য ঘটছে, তারা মুখ সরিয়ে নিয়ে অন্য স্নতবৃন্ত খোঁজে। বোতলে সেটা সম্ভব নয়। এছাড়া মাতৃদুগ্ধ সহজপাচ্য। শিশুদের স্বাভাবিক মল নরম ও ত্যাগ অনায়াস হওয়া দরকার। স্তনদুগ্ধপানে সেটা হয়। এছাড়া বোতলের দুধ খেলে মায়ের শরীরের উষ্ণ আরাম পাওয়া এবং শিশুর নিজস্ব উপলদ্ধি অনুযায়ী স্তনত্যাগ বা পরিবর্তন সম্ভব নয়।

 √ তবে ক্ষেত্র বিশেষে বোতলের দুধও অপরিহার্য হয়ে পড়ে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কোনো কারণে বুকের দুধ খাওয়ানো নিষেধ করা হয় প্রথম থেকেই। কখনো কখনো অজ্ঞান কারণে শিশু নিজেই মাতৃস্তন স্পর্শ করতে চায় না। সে সব ক্ষেত্রে বোতলের দুধ দিতেই হয়।

 √ কখনো কখনো মাকে কোনো রোগের জন্য ওষুধ খেতে হয়। সেই সব ওষুধের কিছু কিছগু পার্শ্বক্রিয়া স্তনদুগ্ধকে প্রভাবিত করে না, শিশুর কোনো ক্ষতি হয় না, কিন্তু মায়ের যদি মূর্ছারোগ হয়ে থাকে তাঁর জন্য যে ওষুধ দেওয়া হয় তাঁর প্রতিক্রিয়া স্তনদুগ্ধের মাধ্যমে শিশুর উপর পড়তে পারে। তখন স্তন দুগ্ধ ত্যজ্য। মায়ের ম্যানেনজাইটিস হলেও একই কথা। বা এই ধরণের কিছু কিছু রোগের ও চিকিৎসার প্রতিক্রিয়া শিশুর উপর পড়ার আশঙ্কা থাকলে শিশুকে মায়ের দুধ না দেওয়াই বাঞ্চনীয়। এসব ক্ষেত্রে মায়ের গর্ভধারণের চূড়ান্ত অবস্থায় চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হয়।

 √ কখনো কখনো প্রবল প্রয়াস থাকা সত্ত্বেও দেখা যায় শিশুর ওজন তো বাড়ছেই না, বরং কমছে। এর কারণ শিশুর হজম প্রক্রিয়া বা পেটের কোনো অসুখ যেমন পীইলোরিক স্টেনোসিস (pyloric Stenosis) । এই রোগ নির্ণয় করে চিকিৎসা ও আরোগ্য এমন কিছু কষ্টকর নয়। তবে কঠিন ব্যাপার হচ্ছে যখন শিশু কোনো ভাবেই ল্যাকটোনা (দুগ্ধ জাতীয় শর্করা ) হজম করতে পারে না তখন বিকল্প খাদ্য দিতেই হবে।
 √ এছাড়া কোনো বিশেষ কারণে শিশুকে আলাদা রাখতে হলে; মা যদি স্তন্যদুগ্ধ সম্পর্কে অচিকিৎসীয় মতামতে নির্ভর করে স্বাভাবিক পরিমাণ স্তনদুধ উৎপাদনে অক্ষম হয়ে পড়েন, তখন বোতল দুধ দিতেই হয়।

 √ কখনো কখনো মানসিক ভারসাম্যের অভাবে শিশু নিজেই মায়ের দুধ খেতে চায় না। কোনো কোনো শিশু জম্মায় বিকলাং মুখ ও চোয়াল নিয়ে। তাদের পক্ষে বোতল ছড়া পায় থাকে না। তবে যে মা নিজেই বিকলাঙ্গ হয়ে জম্ম নিয়েছিলেন, তিনি শিশুকে দুইধ খাওয়াতে সক্ষম।

 √ যদি কোনো মা শিশুকে স্তন্য পান করাতে একেবারেই অনিচ্ছুক থাকেন, অথবা স্তন্যদানের সময়ে কোনো কারণে ক্রমাগত যন্ত্রণা ভোগ করেন তবে শিশু কিন্তু সেটা বুঝতে পারে। মায়ের মনোগত বীতস্পৃহা মাতৃস্তনে দুধের সরবাহকে কিন্তু ক্রমে কমিয়ে দেয় এবং শিশু তার প্রয়োজন মতো খাদ্য মাতৃস্তন থেকে সংগ্রহ করতে পারে না। আর মায়ের এই অনিচ্ছা যদি ঘেন্নায় রূপান্তরিত হয় তখন কিন্তু শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর চেষ্টা না করাই বাঞ্ছনীয়। তবে সে ক্ষেত্রে সরাসরি বোতলের দুধ খাওয়ানোর পদ্ধতি গ্রহণ করার প্রয়াসের আগে অভিজ্ঞ কোন ব্যক্তির সঙ্গে বা ডাক্তারের সঙ্গে বা শিশুর বাবার সঙ্গে এ বিষয়ে বিশদ আলোচনা করলে অনেক সময়ে সুফল পাওয়া যায়।

 √ বোতলের দুধ খাওয়ানো অর্থে অনেক সময়ে শিশুর ক্ষেত্রে অন্যের সান্নিধ্যে আসা—বিশেষ করে মাকে যদি তখন না পাওয়া যায়। সে ক্ষেত্রে অন্য কোনো ব্যক্তির থেকে শিশুর ব্বাবাকে দিয়ে এই কাজ করানো অনেক সুফল দায়ী। যদিও এই বিষয়ে সেরকম গবেষণাজকাত কোনো প্রমাণ নেই। তবুও অনেক ক্ষেত্রেই এটার সুফল পাওয়া গেছে।

 √ শিশুর জন্য মাতৃদুগ্ধ উৎপাদনে মাকে প্রতিদিন ৬০০ থেকে ৮০০ ক্যালরি খাবার বেশি খেতে হয়। তবুও বোতলে দুধ খাওয়ানোর জন্য বোতল কেনা, বাইরের দুধ (কৌটোরই হোক বা অন্য কোনো প্রাণীরই হোক) কেনা বোতলকে দুষণমুক্ত কপ্রার ব্যবস্থা রাখা—ইত্যাদিওতে যে খরচ পড়ে—মাকে অতিরিক্ত যে খাবার খেতে হয় তার জন্য খরচ পড়ে তুলনায় অনেক কম। মাতৃদুগ্ধ প্রবাহ বজায় রাখার জন্য মাকে নিত্য মাংস পোলাও বা ঐ রকম বেশী দামী খাবার খাওয়ার কোনো দরকার নেই। শিশুর জম্মের পর প্রথম সপ্তাহে মাকে যে বিশেষ বিশেষ খাবার খেতে হয় ক্রমে তার প্রয়োজনও কমে আসে। স্বাভাবিক খাদ্য গ্রহণেই দুগ্ধ প্রবাহ বজায় থাকে। ফলে সামগ্রিক হিসেবে বোতলের দুধ খাওয়ানোর থেকে বুকের দুধ খরচ অনেক কম।

 √ মায়ের দুধ খায় সেসব শিশু তাদের মল হয় নরম হলদে। কোনো অস্বস্তিকর গন্ধও তাতে থাকে না। বোতলের দুধ খাওয়া বাচ্ছাদের মল হয় অনেকটা বয়স্কদের মতো। বুকের দুধ খাওয়া বাচ্ছাদের বমিতেও কোনো দুর্গন্ধ থাকে না। বিষয়গুলি নেহাত মামুলি মনে হতে পারে, তবে এ থেকে একটা সিদ্ধান্ত পৌঁছোন কি অমূলক হবে যে এতে শিশুর প্রতি মায়ের যত্নের প্রয়োজনীয়তা যে অনেক বেশী দরকার সেই সত্যটা প্রমাণ হয়!

 √ সাম্প্রতিককালে সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, যে সমস্ত মায়েরা বুকের দুধ খাওয়ানোর পক্ষপাতী, তাঁদের মধ্যে শতকরা আশিভাগই মনে করেন এতে শিশুর স্বাস্থ্য ভালো থাকে, ভালো হয়। নিজের সন্তানের জন্য নিজেকে সঁপে দিচ্ছেন, মায়ের এই মানসিক তৃপ্তিও মাকে অনেক বেশী আনন্দ দেয়। বিশেষ করে যখন শিশু রোগের প্রাদুর্ভাব দেখায আয় বিচ্ছিরি ভাবে, তখন তো মায়ের কাছে এটা একটা স্বস্তির ও উল্লাসের কারণ।

শতকরা চল্লিশভাগ মা মনে করেন বুকের দুধ খাওয়ানো অনেক বেশী সুবিধেজনক, তেইশ ভাগ মনে করেন এটাই তো প্রাকৃতির ও স্বাভাবিক। বুকের দুধের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটা স্বাভাবিকতা। দুধ রয়েছে উৎসস্থলে, শিশুর চোয়ালের টানে বেরিয়ে আসে অমৃত। দুধ নিঃসারিত হওয়ার জন্য ঠিক যতটুকু উত্তাপ আর যতটুকু একটানা ‘টানে’র দরকার শিশুর মুখ থেকে তার উৎসারণ হয়। এই দুধে দুধ গোলা, জ্বাল দেওয়া, পাত্র নির্দূষণ করা কোনো—কিছুর দরকার নেই। প্রয়োজন নেই হাতের কাছে নিপল বা বোতল বা দুধ না থাকায় দোকানের জন্য ছোটা, রাস্তায় জ্যামে গাড়ী আটকে থাকলে হা বোতল—হা বোতল করার!

প্রয়োজন কেবল নিজের বুকের কাছে সন্তানকে তুলে ধরে বক্ষাবরণী সরিয়ে স্তনবৃন্তটি শহিশুর মুখে ধরিয়ে দেওয়া। শিশু হয়তো কোনো কারনে ভয় পেয়েছে, কোনো কারণে কষ্ট পেয়ে কাঁদছে—মায়ের স্তন তাকে শান্ত করবে, ঠান্ডা করতে পারে। এমন কি গভীর রাতে বাবা মা ক্লান্তিতে গভীর ভাবে যখন নিদ্রামগ্ন, তখন হয়তো শিশু কাঁদতে শুরু করল, মা ঘুমের ঘোরে পাশ ফিরে শিশুর মুখে স্তনের বৃন্ত ধরিয়ে দিন—শিশু চুপ করে যাবে।

বাবা—মার ঘুম ভাঙ্গাবে না। যত দিন যাচ্ছে বুকের দুধ খাওয়ানো কিন্তু তত সুবিধাজনক বলে প্রতিভাত হচ্ছে। যে সব মায়েরা কোনো কারণে হয়তো বা প্রথম সন্তানকে স্তন্য পান করাতে পারেন নি—এবং পরে পারলেও আর সে ভাবে নিজেদের নিয়োগ করলেন না—তাঁদের দুর্ভাগ্য। কাজটা আগের সন্তানের চুল আঁচড়ে দেওয়া বা স্বামীর জামায় বোতাম আটকাবার মতোই সহজ ও সামান্য সময়ের ব্যাপার। অথচ পেছনে রয়েছে এক গভীর আত্মতৃপ্তি ও আত্মসুখ। এবং মনে রাখা দরকার, জম্মের সঙ্গে সঙ্গে শিশু প্রথমেই যতবার স্তন্য পান করে, পরে কিন্তু আর ততবার করে না। আট মিনিট সময় বড়জোর লাগে তার একবার পেট ভরতে।

মা নানান কাজের ফাঁকে ফাঁকে যখন বিশ্রাম নিচ্ছেন, তখনই কিন্তু পারেন কাজটা করতে। গর্ভসঞ্চারের সময়ে; গর্ভবর্তী অবস্থায় মায়ের উদরের বৃদ্ধি ঘটে, শরীরের অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়—বুকের দুধ খাওয়ালে হরমোন প্রক্রিয়ায় তার পরিবর্তন ঘটে উদরপ্রদেশ আকার স্বাভাবিক হয়ে আসে। পরিপূর্ণ ভাবে বুকের দুধ খাইয়ে গেলে (মাঝে মাঝে বোতল, মাঝে মাঝে বুকের দুধ নয়) মেয়েদের আবার গর্ভসঞ্চারের সম্ভাবনা, রজঃস্রাব দীর্ঘ বিলম্বিত হয়—এমন কি শিশু শক্ত খাবার খাওয়ার পরও এই নিরোধক অবস্থা চলতে পারে।

তবে অবশ্যই মনে রাখতে হবে এটা কিন্তু কোনো স্থায়ী গর্ভনিরোধক ব্যবস্থা নয়। প্রাকৃতিক নিয়মে শিশুর খাদ্যের জন্য মায়ের শরীরে জমা হয় অতিরিক্ত চর্বি। শিশুর দুধ খাওয়ার মাধ্যমে সেটা আসতে আসতে ঝরে গিয়ে মা তার আগের চেহারা ফিরে পান। কিন্তু বোতলে দুধ খাওয়ালে সেটা সম্ভব নয়। এমনকি অনেক সময়ে অনেক মা আগের থেকেও তম্বী হয়ে যান অতিরিক্ত ক্যালরি ব্যয়ে। তার মানে আবার এই নয় যে প্রতিবার বুকের দুধ খাওয়ানো মাত্র মা একটু একটু করে ক্ষীণ হবেন।

অনেক সময়ে বুকের দুধ খাওয়ানোর সম্পূর্ণ বন্ধ করার পর তাঁর শরীরে পরিবর্তন দেখা দেয়। আবার যদি কোনো স্বভাব স্থুল কায়া মনে করেন যে তিনি বুকের দুধ খাইয়ে স্লীম হয়ে যাবেন, তবে সেটা ভাবা ঠিক হবে না। √ স্তন লেহনে মেয়েদের যৌনতৃপ্তির একটা অঙ্গ। অনেক মায়েরা এই কারণে স্তন্যপান পছন্দ করেন, অনেকে আবার সেই কারণেই একে অপছন্দ করেন। তবে এ ব্যাপারে মুক্তমন থাকাই বাঞ্ছনীয়। দুটি বিষয়কে গুলিয়ে ফেলা উচিৎ নয়।

 √ যখন শিশু বুকের দুধ খায়, তখন সে তাঁর গা নেড়ে, চোখের তারা নাড়িয়ে, শরীর বাঁকিয়ে নিজের মনের ভাব প্রকাশ করে। যে মায়েরা স্তন্যদানে গভীর ভাবে আত্মনিয়োগ করেন, তারা মর্ম উপলদ্ধি করেন, মনের মধ্যে উপলদ্ধি করেন এক স্বর্গীয় আনন্দ। কেউ কেউ এতে এতো তৃপ্তি পান, যে শিশু স্তন্যপান ছেড়ে দিলে মনে মনে তারা কষ্ট পান।মনে রাখা দরকার এই একই আনন্দ কিন্তু পায় শিশুরাও । মায়ের হাসি, শরীরীও স্পর্শ, সুখানন্দ শিশুকেও একইভাবে তৃপ্তি, সুখ, আনন্দ দান করে। গবেষণায় দেখা গেছে আটদিন বয়সের বাচ্ছা যারা বুকের দুধ খায়—তারা চুমুতে, দোলানিতে, স্পর্শে যত সাড়া দেয়—সেই বয়সের বোতলের দুধ খাওয়া বাচ্ছারা ততটা দেয় না। দু’ধরণের বাচ্ছাদের আট সপ্তাহ বয়সেও এই তারতম্য দেখতে পাওয়া যায়।

 √ কিছু কিছু ক্ষেত্রে অবশ্যই স্তন্যপান অসুবিধেকর হতে পারে। মা যদি এমন কোনো উঅসুখে আক্রান্ত হন যা বুকের দুধের মাধ্যমে শিশুকে আক্রমণ করতে পারে তখন স্তন্যপান অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। কিডনি, ফুসফুস, হৃদপিণ্ড ইত্যাদির রোগ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে কাজটা করা উচিৎ। মায়ের যদি স্তনে ক্যান্সার থাকে তবে অবশ্যই সন্তানকে স্তন্যপান না করানোই বাঞ্ছনীয়। অনেকে অবশ্য বলেন বুকের দুধ খাওয়ালে স্তনের ক্যান্সার হয় না—এ তথ্য কিন্তু এখনো প্রমাণিত হয়নি।

√ দুধ তৈরী হয় একজনের শরীরে। এটার নিঃসরণ ঘটে এমন একজনের দ্বারা যার পৃথিবীতে না আছে কোনো অভিজ্ঞতা না আছে কোনো জ্ঞান। সুতরাং কোনো অসুবিধে হলে অনেক সময়ে সেটা শিশুর ক্ষেত্রে প্রকাশ ঘটে না, বা মায়ের বুঝতে দেরি হয়। তবে কোনো অসুবিধেই সম্পূর্ণ দূর করা যায় না যে তা নয়। তবে অনেক সময়ে বুকের দুধ খাওয়াতে গিয়ে মা হয়ে পরেন ক্লান্ত, তাঁর যন্ত্রণা হয়, সন্তানকে সুখ ও তৃপ্তি দিতে সক্ষম হয় না, তখন অবশ্যই বোতলের দুধই একমাত্র উপায়। অভিজ্ঞজনের পরামর্শেরও দরকার আছে তখন।

√ শিশুকে কিভাবে খাওয়ানো হবে, সেটা অবশ্য বাবা—মা দুজনেরই সিদ্ধান্ত সাপেক্ষ। অনেক বাবাই কিন্তু স্তন্যদুগ্ধের পক্ষপাতী। তবে যদি ভাবী পিতা ভাবনার পতিপন্থী হন—মা পক্ষপাতী, মা তাঁকে বোঝাতে পারেন; বা প্রতিবেশী, বন্ধু যে সব বাবাদের শিশুরা মায়ের দুধ খেয়েছেন তাঁদের পরামর্শ নেওয়াতে পারেন। গের প্রয়োজন আছে, বিশেষ করে মা যদি এর পক্ষপাতী হন। বাবাকে বোঝানো প্রয়োজন। মূল কথা বাবাকে রাজী করানো দরকার। অনেক সময়ে ভাবী বাবা ভাবতে পারেন, আরে! এ ব্যাপারে আমার করার কি আছে? খাওয়াবে মা—খাবে বাচ্ছা! এ ধরণের নিস্পৃহভাব কিন্তু শিশুর পক্ষে ক্ষতিকর। এ কথাটা মনে রাখা দরকার।

√ জনসমক্ষে শিশুকে স্তনদান সম্পর্কে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি যুগে যুগে পরিবর্তিত হয়েছে। বহু অতীতে প্রকাশ্য স্তনদানের মধ্যে কোনো রকম অশালীন বা কামদ কোনো ভাবনা মানুষের মনে স্থান পায়নি। পরে এক সময়ে নারীর বক্ষযুগল যখন যৌন—কামনার প্রকাশ্য ভঙ্গি রূপে বিজ্ঞাপনে, চলচ্চিত্রে বা ব্যবসায়িক প্রয়োজনে ব্যবহৃত হতে শুরু হয়, তখন শিশুকে মায়ের স্তন্যদানের মতো পবিত্র বিষয়কে নারীর শরীরের যৌন প্রতীকরূপে ব্যবহৃত হওয়ায়, প্রকাশ্য স্তনদানকে কিছু কিছু মানুষ তীক্ষ্ম সমালোচনার চোখে দেখতে শুরু করেন, এবং বিরোধিতায় মুখর হয়ে ওঠেন। বিশেষ করে ১৯৬০ সাল থেকে পাশ্চত্যে এ নিয়ে প্রচুর হই চই শুরু হয়।

সেই মনোভাব অনেকটা কমে এলেও, এখনো কোনো একটা পরিচিত –অপরিচিত সমাবেশে, উসবের অঙ্গনে কোনো নারীকে স্তন্যপান করাতে দেখলে অনেকেই অস্বন্তিবোধ করেন, কারণ এখনকার মানুষ এতে অভ্যস্থ নন। একটা শাল বা চাদর এই উভয় পক্ষের অস্বস্তি কাটিয়ে দিতে পারে। তবে এ বিষয়ে মাকে অনেক বেশী দৃঢ়প্রতিজ্ঞ থাকতে হবে, তখন তাঁর কাছে এর থেকে পবিত্র ও সৎ কাজ আর কিছু নেই—এটাই মনে রাখতে হবে, না হলে মনস্তাত্ত্বিক কারণে তাঁর পীযূষ ধারা প্রবাহ কমে যেতে পারে।
Share on Google Plus

About Unknown

0 comments:

Post a Comment

Thanks for your comments.