স্ত্রীজাতীয়াদের তরফ থেকে বরাবরই আসে একটু বাঁধা, একটু ছলনা। পুরুষকে তারা ইচ্ছা করেই একটু খেলাতে থাকে, তাতে পুরুষের আগ্রহ আরো বেশি তীব্র হয়ে ওঠে। বাঁধা পেয়ে পুরুষ যদি অপ্রস্তুত হয়ে ফিরে যেতে চায়, অমনি স্ত্রীজাতীরা আসে এগিয়ে। আবার সেই প্রার্থীকে নতুন করে প্রলুদ্ধ করতে থাকে। এমনিভাবে খেলতে খেলতে শেষ পর্যন্ত সেই সঙ্গমই ঘটে।
নইলে সৃষ্টি রক্ষা হবে কিসে! যৌন তাড়না কোন জীবের মধ্যে নেই? একটিমাত্র মক্ষীরানীর পিছনে ছুটে চলে শত শত পুরুষ মক্ষিকা। তার মধ্যে যেটি শক্তিমান তারই হয় জিত, রানীর সঙ্গে সঙ্গমে নিযুক্ত হয়ে তারই উম্মত্ততায় সেই অবস্থাতেই সে জীবন পর্যন্ত ত্যাগ করে।
প্রজাপতিরা গুটিপোকার অবস্থায় থেকে বহুকালের সাধনার ফলে উড়বার সামর্থ্যটুকু পেলেই ডানায় বিচিত্র রং মাখিয়ে উড়ে যায় সঙ্গিনীর সন্ধানে।
তখন তার অন্য কোনো দিকে ভ্রূক্ষেপ নেই, এমন কি খাদ্য আহরণেরও অবসর নেই। প্রথম নারী-প্রজাপতি যাকে দেখতে পায় তাকেই সে অধিকার করে। যৌন আকাঙ্ক্ষা মিটে গেলে তখন কিছু পরেই তার মৃত্যু ঘটে। পিঁপড়ের পাখা ওঠে কিসের জন্য? আমরা যে বলি ‘মরিবার তরে’ সে কথা খুব ঠিক নয়। পাখা ওঠে আগে সঙ্গমের তরে, তার পরে মরিবার তরে। শত শত পিঁপড়ে পাখা গজিয়ে উড়ে চলে যায় হয়তো একটি মাত্র স্ত্রী পিঁপড়ের উদ্দেশ্যে। সেখানে তারা উপর্যুপরি সঙ্গম করতে থাকে। একজন ছাড়তে না ছাড়তে তাকে অধিকার করে অন্য একজন। তারপর সকলেই যায় মরে। স্ত্রী- পিঁপড়েটি এরপর ধীরে সুস্থে নতুন পিঁপড়ের ঝাঁকের জম্ম দিতে থাকে।
মানুষও প্রকৃতির সৃষ্ট জীব। তার মধ্যেও রয়েছে ঐ দুর্বার সঙ্গম প্রবৃত্তি। কিন্তু তবুও তার মস্তিক স্বতন্ত্র, তার দেহবোধ ও মনোবোধ স্বতন্ত্র। তার বেলা সকলই স্বতন্ত্র। মানুষের প্রবৃত্তি জন্তুদের মতো শুধু দেহ-সঙ্গমের প্রবৃত্তি নয়। ওরই মধ্যে আরো কিছু বিশেষত্ব আছে। মানুষের সঙ্গমের দুটি দিক। এক দিকে সঙ্গম হয় লিঙ্গের সঙ্গে যোনির, সেই সঙ্গে অন্য সঙ্গম হয় মনের সঙ্গে মনের। মনকে বাদ দিয়ে সে শুধুই এক্তরফা দেহ-সঙ্গম করতে চায়না। করতে পারে না বলা ঠিক নয়, কারণ মানুষ সবই পারে। মন আছে বলেই সে ইচ্ছা করে নিজের মনকেও বাদ দিতে পারে কিন্তু তেমন ভাবে যদি সে নিছক দেহ-সম্ভোওগি করতে ছোটে, তাহলে অন্তত তখনকার মতো সে মানুষ নয়। যৌনমিলনের ব্যাপারে জানোয়ারে এবং মানুষে তফাৎটা এইখানে। জানোয়ারদের মধ্যে কোনো দিক দিয়ে কোনো পছন্দের বালাই নেই।
যে-কোনো স্ত্রীর সঙ্গে কয়েক মুহূর্তের নিশ্চিন্ত সঙ্গমে আবদ্ধ হতে পারে। জানোয়ারদের মধ্যে আগের থেকে কোনো সম্পর্ক পাতাবার দরকার হয় না, কোনো বাধ্যবাধকতার অস্তিত্ব থাকে না। ঋতুকাল উপস্থিত হলেই স্ত্রী-জাতীয়ারা পুরুষকে সঙ্গমের সুযোগ দেয়। কিন্তু সময় ফুরিয়ে গেলে তখন কোন সম্পর্ক নেই, পুরুষকে আর কাছেও ঘেঁষতে দেয় না। পুরুষে এবং নারীতে সম্পর্ক কেবল সেই ক্ষণিকের। তার মধ্যে একনিষ্ঠতার কোনো বালাই নেই, কারণ সেখানে মন বলে কোনো কিছুর অস্তিত্বই নেই। কিন্তু মানুষের বেলা মনটাই হলো প্রধান। আগে চাই মনের দিক দিয়ে সঙ্গমের পাত্রটিকে ভালো লাগা। মানুষ মন দিয়ে আপন অংশীদার মনোনীত করবে, তবে জাগবে তার আকর্ষণ, তবে করবে সে অপর পক্ষকে অন্তরের সেই আকর্ষণ দিয়ে জাগাবার সাধনা। স্থুল যৌন সঙ্গম তার অনেক পরের কথা।
কোনো এক বিশেষ জনের প্রতি মনের এই আকর্ষণের নাম প্রেম। এটি মানুষের মনের এক বিচিত্র বৃত্তি। কুকুর বা অন্যান্য গৃহপালিত জন্তুর মধ্যে একটা প্রভুপ্রীতি দেখা যায়, কিন্তু সেও প্রেম নেয়, সে হলো আনুগত্য। যে যখন পালন করবে তখন তার প্রতিই দেটি জম্মাবে।
কিন্তু মানুষের প্রেম স্বতন্ত্র জিনিস, তার মধ্যে আছে বর্ণনাতীত এক উপলদ্ধি। বিজ্ঞানিরা বলেন যে মস্তিস্কের মধ্যে এই উপলদ্ধির স্বতন্ত্র এক কেন্দ্রও আছে, যদিও তা আজ পর্যন্ত আবিস্কৃত হয়নি। প্রেমের এই স্বাভাবিক বৃত্তিটি সুপ্ত অবস্থায় থাকে, সুযোগ পেলেই জেগে ওঠে। একজন কাউকে অত্যন্ত ভালোবাসবে, মানুষের পক্ষে এটা কিছু কঠিন নয়। অল্প কিছু কারণ থেকেই মানুষের মানুষকে ভালো লাগে। মানুষের মধ্যে প্রেমের উদয় হতে বিশেষ বিলম্ব হয় না।
এই প্রেম তিন রকম ভাবে জেগে উঠতে পারে। প্রথমত এমন হতে পারে যে একজনকে দেখেই হঠাৎ অমনি অত্যন্ত ভালো লেগে গেল, যাকে বলে প্রথম দৃষ্টিতে প্রেম। দ্বিতীয়ত এমন হতে পারে যে একজনের কথাবার্তা শুনে আর ব্যবহার দেখে নানা দিক দিয়ে সুযোগ্যতার পরিচয় পেতে পেতে একটু একটু করে ভালো লাগতে শুরু হলো, এবং সেই ভালো লাগা তার পরে একদিন প্রেমরূপে দাঁড়িয়ে গেল।
তৃতীয়ত এমনও হতে পারে যে একজনকে ভালো লাগার মোটে কোনো অভাসই নেই, বরং তাকে দেখলে একটু বিরক্তই লাগছে, কিন্তু কিছু কাল পরে হঠাৎ তাকে এক নতুন দৃষ্টিতে যেন নতুন মানুষের মতো চিনতে পারা গেল, তখন তার প্রতি প্রথম দর্শনের মতোই গভীর প্রেম জম্মে গেল। এর মধ্যে অনেক প্রশ্ন আছে। কেন আমাদের হঠাৎ এক একজনকে অত্যন্ত বেশি করে পছন্দ হয়? আমরা প্রায়ই শুনে থাকি কারো বা মোটা ভালো লাগে, কারো বা রোগাই পছন্দ, কারো বা ফর্শা রং ভালো লাগে, কারো বা কালোই পছন্দ,
নরম চরিত্রের মানুষকে পছন্দ হয়, কারো বা পছন্দ হয় খুব কড়া লোক। পছন্দের এত
অদ্ভুত বৈচিত্র্য আমাদের মনের মধ্যে আসে কোথা থেকে? কেউ বলবে অমুকের যে অমুককে ভালো লাগছে, সেটা নিশ্চয় ওদের জম্মজম্মান্তরের সম্পর্ক থেকে।
কেউ বলবে অমুকের সঙ্গে অমুকের জোড় গোড়া থেকেই মিলিয়ে সৃষ্টি হয়েছিল। কে বলবে এর পিছনে নিশ্চয় কোনো এক অদৃশ্য হাত রয়েছে। বলা বাহুল্য এ-সমস্তই ধারণার কথা, কোনোটারই বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। প্রেম গেজে ওঠে অকস্মাৎ , কিন্তু কার প্রতি কেন যে প্রেম জাগলো এর সহজে কোনো সদুত্তর দেওয়া যায় না। তাই আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় যেন এটা হেঁইয়ালির মতো।




0 comments:
Post a Comment
Thanks for your comments.